২৫ শে বৈশাখ | কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর জীবনী ও সৃষ্টিকর্ম

রবীন্দ্রনাথ – এই নামটির সাথেই যুক্ত হয়ে আছে আপামর বাঙালির গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং আবেগ। তিনি ভারতবর্ষের প্রতিটি বাঙালির মননে, চিন্তাধারায় অমর হয়ে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। যতদিন বাংলা ভাষার অস্তিত্ব থাকবে ততদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন ২৫ শে বৈশাখ , এই দিনটি রবীন্দ্র জয়ন্তী বলে সারা পৃথিবীর মানুষ উদযাপন করে থাকেন। এই বছর 9th may 2022 (২৫ শে বৈশাখ ২০২২) তে দিনটি রবীন্দ্র জয়ন্তী পড়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন সাহিত্যিক, কবি, সঙ্গীতশ্রষ্ঠা, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার এবং চিত্রশিল্পী ছিলেন। তিনি প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী এবং দার্শনিক-ও ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন স্বাধীন মনের অধিকারী মানুষ। তাঁর শরীর চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী থাকলেও তাঁর চিন্তাধারা কোনভাবেই গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকে নি।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও সৃষ্টিকর্ম
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও সৃষ্টিকর্ম

ছোটবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আবেগী। তিনি দরিদ্রের প্রতি সমব্যথী এবং স্বাভাবিক নিয়মের বিপরীতে থাকা একজন বিদ্রোহী। সেই কারণে তিনি বদ্ধ পরিবেশের মধ্যে পড়াশোনা করেন নি। ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে উন্মুক্ত পরিবেশে শিক্ষালাভ করতে পারে সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর বিশ্বভারতী স্থাপন করা।

রবি ঠাকুর ছিলেন একজন বিশ্ববরেণ্য বাঙালি ব্যক্তিত্ব। তিনি ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ এবং ‘বিশ্বকবি’ নামেও খ্যাত।

Table of Contents

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংক্ষিপ্ত জীবনী

রবি ঠাকুর ২৫শে বৈশাখ ১২৬৮ (৭ই মে ১৮৬১) সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঠাকুরবাড়ি ছিল সেই সময়ের কলকাতার বিত্তবান এবং সংস্কৃতিবান ব্রাহ্ম পিরালী জমিদার পরিবার।
তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মাতা ছিলেন সারদাসুন্দরী দেবী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন পিতা মাতার ১৫টি সন্তানদের মধ্যে ১৪তম এবং ছেলেদের মধ্যে অষ্টম। আর অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিনি ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মামা এবং বিশিষ্ট ঠাকুর পরিবারের সদস্য।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পারিবারিক ইতিহাস

ঠাকুরদের আসল পদবী ছিল কুশারী। কুশারীরা ছিলেন দ্বীন কুশারীর বংশধর। সেই সময়ের মহারাজ ছিলেন ক্ষিতিসূরা। তিনি দ্বীন কুশারীকে বর্ধমান জেলার অন্তর্গত কুশ নামক একটি গ্রাম দেন। দ্বীন কুশারী কুশ নামক গ্রামটির প্রধান ছিলেন। তাই তিনি কুশারী নামে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কুশারীরা ছিলেন রাড়ী ব্রাহ্মণ।

দ্বীন কুশারীর কিছু প্রজন্মের পরে এই পরিবারের একটি শাখা পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে বাংলার পূর্ব অংশে চলে এসেছিল। পরবর্তী বংশধররা বাংলার পূর্ব অংশ (বর্তমানে বাংলাদেশ) থেকে বাংলার পশ্চিম অংশে (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ) ফিরে আসেন।

পঞ্চানন কুশারী আঠারো শতকে হুগলি (রাড়) নদীর ডানতীরে অবস্থিত দক্ষিণিন্দি (বর্তমানে বাংলাদেশ) অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। ১৭২০ সালের দিকে তাঁরা গোবিন্দপুর অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। গোবিন্দপুর পরে কলকাতার একটি গ্রামে পরিণত হয়।

কুশারীরা জাহাজ ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। ব্রাহ্মণ হওয়ার জন্য প্রতিবেশীরা তাদের ‘ঠাকুরমশাই’ বলে সম্বোধন করতেন। ব্রিটিশদের ক্ষমতায় আসার পরে ‘ঠাকুরমশাই’ ঠাকুর পদবিতে পরিণত হয়।
পঞ্চানন কুশারীর দুই পুত্র হলেন জয়রাম এবং রামসন্তোষ। এই জয়রামের চার পুত্র মধ্যে দর্পণরায়ন ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ান। পরে দর্পণরায়ন তার ভাই নীলমণি ঠাকুরের সাথে মেছুয়াবাজার অঞ্চলে চলে যান। এই অঞ্চল পরবর্তীকালে জোড়াসাঁকো হিসেবে পরিচিতি পায়।

মার্বেল প্যালেস এর কাছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির খ্যাতি দ্বারকানাথ ঠাকুরের সময় থেকে এসেছিল। দ্বারকানাথ ম্যাকিনটোস এন্ড কোং-এর এজেন্ট ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ব্যবসায়ী। তিনি উইলিয়াম ক্যারের সাথে অংশীদারিত্বের সাথে প্রথম ব্যবসা শুরু করেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ এবং দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

পড়ুন :- কলকাতা দুর্গা পূজা

শৈশব, কৈশোর ও শিক্ষা

রবীন্দ্রনাথের শৈশব কেটেছিল প্রধানত বোলপুর, পাণিহাটির বাগানবাড়ি এবং জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মধ্যে। মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি প্রথম লেখা শুরু করেন। তবে ১৮৭৪ সালে ‘তত্ত্ববোধনী পত্রিকা’ য় তাঁর লেখা কবিতা ‘অভিলাষ’ প্রথম প্রকাশিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বসার ঘর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বসার ঘর

১৮৭৫ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মা-কে হারান। মাতৃবিয়োগের পর রবি ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায়ই দেশভ্রমণে বেরিয়ে যেতেন এবং বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে অতিবাহিত করতেন। এর ফলে ছোট্ট রবির শৈশব ভৃত্যদের অনুশাসন এবং যত্নে কেটেছিল। ছোটবেলা থেকে রবি ঠাকুর প্রকৃতিপ্রেমী ছিলেন।

তাঁর স্কুলের গন্ডির মধ্যে নিয়মমাফিক পড়াশোনা ভাল লাগতো না। তা সত্ত্বেও তিনি ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নরম্যাল স্কুল, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট, বেঙ্গল একাডেমীর মত নামী স্কুলে কিছুদিনের জন্য পড়াশোনা করেছিলেন।

স্কুলের চার দেওয়ালের থেকে বাড়ির খোলা পরিবেশে রবি ঠাকুরের পড়তে বেশি ভালো লাগতো। ফলে গৃহশিক্ষকের কাছেই তিনি শিক্ষালাভ করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের পিতা ছিলেন শিক্ষাবিদ, ব্রাহ্মচর্য প্রচারক, সমাজসেবক এবং হিন্দু দার্শনিক। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে উপনয়নের পরে তিনি বোলপুর, উত্তরাখণ্ডের ডালহৌসি পাহাড়ে যান। এইসময় তাঁর পিতা তাঁকে সৌরলোক সম্বন্ধে শিক্ষা দিতেন।

এছাড়া পিতার কাছ থেকে তিনি সংস্কৃত, ব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান এবং ইতিহাস নিয়মিত পাঠ নিতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা তাঁকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জীবনী, কালিদাস রচিত ধ্রুপদী সংস্কৃত কাব্য, নাটক এবং উপনিষদ পাঠেও উৎসাহিত করেন।

১৮৭৭ সালে ‘ভারতী’ পত্রিকায় তাঁর কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ রচনা যেমন মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্যের সমালোচনা, ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ এবং ‘ভিখারিণী’ ও ‘করুণা’ নামক দুটি গল্প প্রকাশিত হয়।

১৮৭৮ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবি-কাহিনী’ প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি ‘সন্ধ্যা সঙ্গীত’ রচনা করে। বিখ্যাত কবিতা ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।

Sriniketan Bolpur Biswa Bharati University Santiniketan block

পড়ুন :- মেটকাফ টাউন হল মিউজিয়াম কলকাতা

যৌবন ও বিবাহ

১৮৭৮ সালে ব্যরিষ্টারি পড়ার জন্য ইংল্যান্ড-এ যান। ইংল্যান্ড-এর ব্রাইটনের পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। পরে ১৮৭৯ সালে লন্ডনে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন।
সাহিত্যচর্চার প্রতি আকর্ষণের কারণে তিনি সেই পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। দ্বিতীয়বার বিলেতের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েও মাদ্রাজ থেকে ফিরে আসেন। তা সত্ত্বেও তাঁর স্কুল কলেজের গতানুগতিক শিক্ষা না গৃহীত হলেও বিশ্ব বিদ্যার সকল দুয়ার তাঁর সামনে উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

১৮৮৩ সালের ৯ই ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ ভবতারিণী দেবীকে বিয়ে করেন। ভবতারিণী দেবী ছিলেন ঠাকুরবাড়ির এক অধস্তন কর্মচারী বেনিমাধব রায়চৌধুরীর মেয়ে। বিয়ের সময় ভবতারিণী দেবীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মৃণালিনী দেবী।

পরবর্তীকালে মৃণালিনী দেবী এবং রবীন্দ্রনাথের মোট ৫টি সন্তান হয়। তাঁদের নাম যথাক্রমে মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা এবং শমীন্দ্রনাথ। কিন্তু এদের মধ্যে নিয়তির লিখনে অতি অল্প বয়সেই রেণুকা এবং শমীন্দ্রনাথ মারা যান।

১৮৯০ সালে পিতৃ আদেশ মান্য করার জন্য রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে (বর্তমানে বাংলাদেশের একটি অঞ্চল),পাবনা ও রাজশাহীতে তাঁর বিশাল পৈতৃক সম্পদ পরিচালনা শুরু করেন। তিনি সেখানে ‘জমিদার-বাবু’ নামে পরিচিত ছিলেন।

শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের বিলাসবহুল পারিবারিক বজরা ছিল। বজরাটির নাম ছিল ‘পদ্মা’।এই বজরায় চেপে তিনি প্রজাদের কাছে খাজনা আদায় এবং আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে যেতেন। গ্রামবাসীরাও তাঁর সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করত।

এই সময় রবীন্দ্রনাথ বাউল লালন শাহের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। লালন শাহের লোকগানগুলি কবিকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি লালনের এই লোকগানগুলি জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যে কাজ করেছিলেন।

মধ্যবয়স

১৯০২ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী মারা যান। এরপর রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের ১৯শে জানুয়ারী পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে হারান।
১৯০৫ সালে রবি ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৯০৬ সালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান আধুনিক কৃষি এবং গোপালনবিদ্যা শেখার জন্য।

মধ্য বয়েসেই রবীন্দ্রনাথের কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলা ও বাংলার বাইরে। ১৯৩০-এর দশকের প্রথমভাগে রবীন্দ্রনাথ একাধিক বক্তৃতা, গান এবং কবিতায় ভারতীয় সমাজের বর্ণাশ্রম প্রথা এবং অস্পৃশ্যতার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার

১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ ‘সং অফারিংস’-এর জন্য রবি ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পান। ইংরেজ লেখক এবং রয়াল সোসাইটির সদস্য ষ্টারজ ম্যর নোবেল পুরস্কারের জন্য কবিকে মনোনীত করেছিলেন। এই ঘটনা সুইডিশ একাডেমীকে বিস্মিত করেছিল।

একাডেমীর সদস্য পার হলস্টর্ম রবীন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন। একাডেমীর আরেক সদস্য ভারনার লন হেইডেনষ্টম রবীন্দ্রনাথের লেখা ইংরেজি অনুবাদটির পক্ষে জোরালো লিখিত বক্তব্য দেন। এর ফলে সকল সংশয়-এর অবসান ঘটে।

১৯১৩ সালের ১০ ই নভেম্বর বুধবার এই পুরষ্কার ঘোষিত হয়। ১৫ই নভেম্বর সন্ধ্যায় তারবার্তার মাধ্যমে এই সুখবরটি কবি পান।

শেষ জীবন এবং মৃত্যু

জীবনের শেষ দশকে রবীন্দ্রনাথের মোট ৫০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পুনশ্চ, শেষ সপ্তক, শ্যামলী ও পত্রপুট। জীবনের এই পর্বে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের নানা শাখায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল হল একাধিক গদ্য-গীতিকা ও নৃত্যনাট্য। চিত্রাঙ্গদা, শ্যামা এবং চন্ডালিকা এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া তিনি তাঁর শেষ তিনটি উপন্যাস দুই বোন, মালঞ্চ এবং চার অধ্যায় রচনা করেন।

এই সময় কবির বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়। তাঁর বিশ্বপরিচয় নামক গ্রন্থে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলি সরলগদ্যে লিপিবদ্ধ করেন। সে, তিনসঙ্গী, গল্পসল্প এই তিনটি কাব্যে বিজ্ঞানী চরিত্রকেন্দ্রিক একাধিক গল্প সংকলিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। কলকাতার সাধারণ মানুষের আর্থিক দুরাবস্থা এবং ব্রিটিশ বাংলাদেশের দ্রুত আর্থসামাজিক অবক্ষয় কবিকে বিশেষ বিচলিত করে তুলেছিল। তিনি গদ্যছন্দে রচিত একটি কবিতায় এই চিত্র তুলে ধরেছিলেন।

জীবনের শেষ ৪ বছর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। এরমধ্যে দুইবার অসুস্থতার কারণে চলনশক্তি হারিয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৭ সালে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। ১৯৪০ সালে অসুস্থ হবার পর তিনি আর সেরে উঠতে পারেন নি। এইসময়ের তাঁর লেখা কবিতাগুলি ছিল মৃত্যুচেতনাকে কেন্দ্র করে।

১৯৪১ সালে দীর্ঘ রোগভোগের পর জোড়াসাঁকোর বাসস্থানেই ৭ই আগস্ট (২২শে শ্রাবণ ১৩৮৪ বঙ্গাব্দে) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভ্রমণ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবদ্দশায় মোট ১২বার বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। তিনি পাঁচটি মহাদেশের ত্রিশটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন।

ইউরোপ

প্রথম জীবনে ১৮৭৮ এবং ১৮৯০ সালে তিনি ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। ১৯১২ সালে চিকিৎসার জন্য পুনরায় ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। ১৯২০-২১ সালে রবীন্দ্রনাথ ইউরোপে গিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে কবি শেষবার ইংল্যান্ডে যান অক্সফোর্ডে হিবার্ট বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। এরপর তিনি ভ্রমণ করেন ফ্রান্স, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও সোভিয়েত রাশিয়া।

চীন, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

১৯১৬-১৭ সালে জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে কতকগুলি বক্তৃতা দেন। তাঁর এই বিরূপ মতামতের জন্য উক্ত দুই দেশে সেই সফরকালে তিনি প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। এই বক্তৃতাগুলি সংকলিত হয় তাঁর ন্যাশনালিজম গ্রন্থে।
১৯২০-২১ সাল নাগাদ কবি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। এই সফরের সময় পাশ্চাত্য দেশগুলিতে তিনি সংবর্ধিত হয়েছিলেন। ১৯২৪ সালে রবীন্দ্রনাথ চীন এবং জাপান সফরে যান। ১৯৩০ সাল নাগাদ আবার তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-এ যান।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জাপান যাত্রা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম জাপান যাত্রা

পেরু ও আর্জেন্টিনা

১৯২৪ সালের শেষের দিকে পেরু সরকারের আমন্ত্রণে সেদেশে যাওয়ার পথে আর্জেন্টিনায় অসুস্থ হয়ে কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথ্যে তিন মাস কাটান। স্বাস্থ্যের কারণে পেরু ভ্রমণ তিনি স্থগিত করে দেন।

ইতালি, গ্রিস, তুরস্ক ও মিশর

১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ বেনিতো মুসোলিনির আমন্ত্রণে ইতালি সফরে গিয়েছিলেন। প্রথমে মুসোলিনির আতিথেয়তায় মুগ্ধ হলেও, পরে লোকমুখে তার স্বৈরাচারের কথা জানতে পেরে, মুসোলিনির কাজকর্মের সমালোচনা করেন কবি। এর ফলে উভয়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ছেদ পড়ে। এরপর রবীন্দ্রনাথ গ্রিস, তুরস্ক ও মিশর ভ্রমণ করে ভারতে ফিরে আসেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

১৯২৭ সালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়সহ চার সঙ্গীকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরে। এই সময় তিনি ভ্রমণ করেন বালি, জাভা, কুয়ালালামপুর, মালাক্কা, পেনাং, সিয়াম ও সিঙ্গাপুর।
১৯৩২ সালে ইরাক ও পারস্য ভ্রমণে গিয়েছিলেন কবি। ১৯৩৪ সালে তাঁর সর্বশেষ বিদেশ সফর ছিল সিংহলে।

ইউরোপ-প্রবাসীর পত্র , ইউরোপ-যাত্রীর ডায়ারি , জাপান-যাত্রী, রাশিয়ার চিঠি, ইত্যাদি নানা গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাগুলি লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলেন। ব্যাপক বিশ্বভ্রমণের ফলে রবীন্দ্রনাথ তার সমসাময়িক অরিঁ বের্গসঁ, আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট ফ্রস্ট, টমাস মান, জর্জ বার্নার্ড শ, এইচ জি ওয়েলস, রোম্যাঁ রোলাঁ প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছিলেন।

বহুবার বিশ্বপরিক্রমার ফলে তিনি ভারতের বাইরে নিজের রচনার পরিচিতি গড়ে তোলার এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক মতবিনিময়ের সুযোগও পেয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম ও রচনাবলী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র আট বছর বয়সে কাব্যরচনা শুরু করেন। প্রকৃতিপ্রেমী রবীন্দ্রনাথের অনেক অনুরাগী ছিল। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কাদম্বরী দেবী।
কাদম্বরী দেবী ছিলেন তাঁর নতুন দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বউ। নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী তরুণ রবীন্দ্রনাথকে তাঁর সৃজনশীল প্রতিক্রিয়া এবং মন্তব্যের মাধ্যমে কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মূলত একজন কবি। তবে বাঙালি সমাজে তিনি সঙ্গীতস্রষ্ঠা হিসেবে জনপ্রিয়। তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরেও ৫২ টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮ টি নাটক, ১৩ টি উপন্যাস, ৩৬ টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছে।

রবি ঠাকুরের লেখা ৯৫ টি ছোটো গল্প ও ১৯১৫ টি গান যথাক্রমে ‘গল্পগুচ্ছ’ ও ‘গীতবিতান’ সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের লেখা যাবতীয় রচনা ৩২ খন্ডের ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। পত্রসাহিত্যে তাঁর লেখা চিঠিপত্র উনিশ খন্ডে এবং ৪ টি গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তিনি দু’হাজারের বেশি চিত্রের শ্রষ্ঠা।

পড়ুন :- কলকাতা জাতীয় গ্রন্থাগার

কবিতা

Rabindranath Thakur
Rabindranath Thakur

প্রথম জীবনে রবি ঠাকুরের তিনটি কাব্য কবি-কাহিনী, বনফুল ও ভগ্নহৃদয়-এ কবি বিহারীলালের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়।
এরপর তিনি সন্ধ্যাসংগীত, প্রভাতসংগীত, ছবি ও গান, কড়ি ও কোমল কাব্যগ্রন্থ থেকে রবীন্দ্রনাথ নিজের বক্তব্য প্রকাশ করতে শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের প্রেম ও সৌন্দর্য সম্পর্কিত ভাবনা ফুটে উঠেছিল তাঁর মানসী, সোনার তরী, চিত্রা, চৈতালি, কল্পনা ও ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থে।

রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রকাশ পেয়েছে নৈবেদ্য, খেয়া, গীতাঞ্জলি, গীতিমাল্য ও গীতালি কাব্যগ্রন্থে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর লেখা বলাকা কাব্য উল্লেখযোগ্য। এছাড়া পূরবী, মহুয়া, পুনশ্চ, শেষ সপ্তক, পত্রপুট, শ্যামলী কাব্যগ্রন্থ রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।

রবীন্দ্রনাথের শেষ কবিতা “তোমার সৃষ্টির পথ”। এই কবিতা তিনি মৃত্যুর সাত দিন আগে মৌখিকভাবে রচনা করেছিলেন।

গীতাঞ্জলি

রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অন্যতম হল ‘গীতাঞ্জলি’। এই কাব্যগ্রন্থে মোট ১৫৭ টি গীতিকবিতা সংকলিত হয়েছে। কবিতাগুলি মূলত ব্রাহ্মভাবাসম্পন্ন ভক্তিমূলক কবিতা। ১৯০৮-১৯০৯ সালে কবিতাগুলি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । এরপর ১৯১০ সালে এই কবিতাগুলি ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়।
১৯১২ সালে এই কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ ‘সং অফারিংস’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ নিজেই করেন। ১৯১৩ সালের ১০ই ডিসেম্বর ‘সং অফারিংস’ এর জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত কবিতগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’।

চিত্ত যেথা ভয় শূন্য

‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ বা ‘হোয়্যার দ্যা মাইন্ড হ্যাস নো ফিয়ার’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ-এর জনপ্রিয় একটি কবিতা।এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথের নতুন এবং জাগ্রত ভারত সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিনিধিত্ব করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

এই কবিতাটি প্রথম “প্রার্থনা”(জুলাই ১৯০১)শিরোনামে নৈবেদ্য শীর্ষকে প্রদর্শিত হয়েছিল। কবি এই কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ উইলিয়াম রত্তেনস্টাইনের অনুরোধের পর ১৯১১ সালের মধ্যে রচনা করেছিলেন।
১৯১২ সালে লন্ডনের ইন্ডিয়ান সোসাইটি দ্বারা প্রকাশিত ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে এটি ৩৫তম কবিতা। ১৯১৭ সালে রবীন্দ্রনাথ কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে ইংরেজি অনুবাদ ‘হোয়্যার দ্যা মাইন্ড হ্যাস নো ফিয়ার’ পাঠ করেন।

জনপ্রিয়তা

এই কবিতা ভারতীয় পাঠ্যপুস্তকগুলিতে প্রদর্শিত হয় এবং বাংলাদেশেও এই কবিতাটি জনপ্রিয়।
২০১০ সালে ভারতীয় সংসদের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই কবিতার কিছু লাইন উদ্ধৃত করেছিলেন।
এ.আর. রহমান ২০১৩ সালে ‘জগাও মেরে দেশ কো’ নামে একটি ভারতীয় স্বাধীনতা দিবসের গান রচনা করেন।
আমির খান সত্যমেব জয়তের (টেলিভিশন অনুষ্ঠান) শেষ পর্বে কবিতাটির হিন্দি সংস্করণটি অনুবাদ করেছেন।
জন আব্রাহামের সিনেমা মাদ্রাজ ক্যাফে’তে মধ্যে কবিতাটির ইংরেজি সংস্করণ পরিলক্ষিত হয়।
২০১৩ সালে শ্রীজিত মুখোপাধ্যায় তাঁর পরিচালিত ছবি মিশরে রহস্যে ব্যবহার করেন।

ছোটোগল্প

বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রধানত ভারতী, হিতবাদী, সাধনা, সবুজ পত্র ইত্যাদি মাসিক পত্রিকাগুলির চাহিদা মেটানোর জন্যই রচনা তাঁর ছোটগল্পগুলি। রবীন্দ্রনাথের এই গল্পগুলি উচ্চ সাহিত্যমূল্য-সম্পন্ন।

তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্প হল কঙ্কাল, নিশীথে, মণিহারা, ক্ষুধিত পাষাণ, স্ত্রীর পত্র, নষ্টনীড়, কাবুলিওয়ালা, হৈমন্তী, দেনাপাওনা, মুসলমানীর গল্প ইত্যাদি।শেষ জীবনে তিনি লিপিকা, সে ও তিনসঙ্গী গল্পগ্রন্থে নতুন আঙ্গিকে গল্পরচনা করেছিলেন।

কখনও তাঁর গল্পে পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলি বা আধুনিক ধ্যানধারণা সম্পর্কে মতামত প্রকাশ পেত আবার কখনও তিনি মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের বৌদ্ধিক বিশ্লেষণকেই গল্পে বেশি প্রাধান্য দিতেন।
রবীন্দ্রনাথের একাধিক ছোটগল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র, নাটক ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মিত হয়েছে। তাঁর গল্পের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রায়ণ হল সত্যজিৎ রায় পরিচালিত তিন কন্যা (মনিহারা, পোস্টমাস্টার ও সমাপ্তি অবলম্বনে) ও চারুলতা (নষ্টনীড় অবলম্বনে), তপন সিংহ পরিচালিত অতিথি, কাবুলিওয়ালা ও ক্ষুধিত পাষাণ, পূর্ণেন্দু পত্রী পরিচালিত স্ত্রীর পত্র ইত্যাদি।

Famous books of Rabindranath Tagore
Famous books of Rabindranath Tagore

কাবুলিওয়ালা

১৮৯২ সালে প্রকাশিত রবি ঠাকুরের ছোটোগল্পগুলির মধ্যে ‘কাবুলিওয়ালা’ অন্যতম।

গল্পসংক্ষেপ

কাবুল থেকে ভারতে তথা কলকাতায় আসা এক ফল বিক্রেতা রহমত শেখ। ফল বিক্রি করতে করতে তাঁর একটি ছোট্ট বাঙালি মেয়ে মিনির সাথে বেশ ভাব হয়ে যায়। মিনি সবসময়ই রহমতকে তার নিজের মেয়ের কথা মনে করিয়ে দিত। রহমত তার দেশের লোকেদের সাথে বোর্ডিং হাউসে থাকত।

একদিন রহমত তার মেয়ের অসুস্থতার খবর পায়। সে দেশে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য রহমত ধারে জিনিস বিক্রি করত। দেশে ফেরার জন্য টাকা আদায় করতে সে তার এক ক্রেতার কাছে যায়। টাকা চাওয়ার ফলে ঐ ক্রেতা এবং রহমতের মধ্যে গোলযোগ বাঁধে। ক্রেতাটি রহমতকে অপমান করে এবং অপমান না সইতে পেরে তাকে ছুরিকাঘাত করে ফেলে। রহমতের উকিল তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও রহমত নিজের দোষ স্বীকার করে নেয়। ফলে তার দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়।

বন্দিদশা থেকে ছাড়া পেয়েই সে তার কন্যাসম মিনির সাথে দেখা করতে যায়। মাঝে দশ বছর কেটে গেছে। মিনি এখন চোদ্দ বছরের বালিকা। তার বিয়ের তোড়জোড় চলছে। মিনি স্বাভাবিকভাবেই রহমতকে চিনতে পারে না। রহমত বুঝতে পারে তার মেয়েও হয়তো তাকে ভুলে গেছে।
মিনির বাবা রহমতের প্রতি সমবেদিত হয়ে তাকে মিনির বিয়ের খরচ থেকে কিছু টাকা দেয় দেশে ফেরার জন্য। রহমতের মেয়ের জন্য উপহার দেন।
মিনির বাবা বুঝতে পারেন তিনি এবং রহমতের জীবন, জীবিকা আলাদা হলেও বাস্তবে তারা দুজনেই পিতা।

‘কাবুলিওয়ালা’ পিতা ও কন্যার মধ্যেকার যে অটুট ভালোবাসা ও বন্ধন তার সরল এবং সাবলীল রূপ।

চলচ্চিত্র নির্মাণ

তপন সিংহ ১৯৫৭ সালে ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্পটিকে সিনেমার পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন।
হেমেন্দ্র গুপ্তের পরিচালনায় ১৯৬১ সালে ‘কাবুলিওয়ালা’ হিন্দি সিনেমার পর্দায় ফুটে ওঠে।
কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘কাবুলিওয়ালা’ বাংলাদেশে ২০০৬ সালে মুক্তি পায়।

উপন্যাস

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট তেরোটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন।এগুলি হল বৌ-ঠাকুরাণীর হাট, রাজর্ষি, চোখের বালি, নৌকাডুবি, প্রজাপতির নির্বন্ধ, গোরা, ঘরে বাইরে, চতুরঙ্গ, যোগাযোগ, শেষের কবিতা, দুই বোন, মালঞ্চ ও চার অধ্যায়। এর মধ্যে গোরা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস।

বৌ-ঠাকুরাণীর হাট ও রাজর্ষি ঐতিহাসিক উপন্যাস। এদুটি রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস রচনার প্রচেষ্টা। এরপর থেকে ছোটগল্পের মতো তার উপন্যাসগুলিও মাসিকপত্রিকার চাহিদা অনুযায়ী নবপর্যায় বঙ্গদর্শন, প্রবাসী, সবুজ পত্র, বিচিত্রা প্রভৃতি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্যজিৎ রায়ের ঘরে বাইরে ও ঋতুপর্ণ ঘোষের চোখের বালি।

প্রবন্ধ ও পত্রসমূহ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অসংখ্য প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন।এইসব প্রবন্ধে তিনি সমাজ, রাষ্ট্রনীতি, ধর্ম, সাহিত্যতত্ত্ব, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, ছন্দ, সংগীত ইত্যাদি নানা বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করেন।তাঁর সমাজচিন্তামূলক প্রবন্ধগুলি এবং রাজনীতি-সংক্রান্ত প্রবন্ধগুলি যথাক্রমে সমাজ এবং কালান্তর নামক সংকলনে সংকলিত হয়েছে।
ছিন্নপত্র ও ছিন্নপত্রাবলী, ভানুসিংহের পত্রাবলী এবং পথে ও পথের প্রান্তে নামক বইগুলি রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য পত্রসংকলন।

নাটকসমূহ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিত উল্লেখযোগ্য নাটকসমূহ হল কালমৃগয়া, বিসর্জন, চিত্রাঙ্গদা ও মালিনী। পরের দিকে তিনি প্রহসন রচনায় মনোনিবেশ করেন। গোড়ায় গলদ ,বৈকুণ্ঠের খাতা ,হাস্যকৌতুক ও ব্যঙ্গকৌতুক এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
এছাড়া তাঁর লেখা কয়েকটি বিখ্যাত নাটক হল: শারদোৎসব, রাজা, ডাকঘর, ফাল্গুনী, মুক্তধারা, রক্তকরবী, তাসের দেশ, কালের যাত্রা ইত্যাদি।
জীবনের শেষ পর্বে তিনি “নৃত্যনাট্য” রচনা করেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন নৃত্যনাট্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নটীর পূজা, শাপমোচন, তাসের দেশ, শ্যামা ইত্যাদি।

সঙ্গীতসমূহ এবং নৃত্যকলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ধ্রুপদি ভারতীয় সংগীত, বাংলা লোকসংগীত ও ইউরোপীয় সংগীতের ধারা তিনটিকে আত্মস্থ করে নিজ সুরে গান রচনা করেছিলেন। তিনি তাঁর বহু কবিতাকে গানে রূপান্তরিত করেছিলেন।
তাঁর রচিত সকল গান সংকলিত হয়েছে গীতবিতান গ্রন্থে। এই গ্রন্থের পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, আনুষ্ঠানিক ও বিচিত্র পর্যায়ে মোট দেড় হাজার গান সংকলিত হয়। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্ট সঙ্গীতসমূহ “রবীন্দ্রসঙ্গীত” নামে পরিচিত।

ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোকনৃত্য ও ধ্রুপদি নৃত্যশৈলীগুলির সংমিশ্রণে তিনি এক নতুন শৈলীর প্রবর্তন করেন যা রবীন্দ্রনৃত্য নামে পরিচিত।

চিত্রসমূহ

প্রায় সত্তর বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন। ছবি আঁকা য় তাঁর কোনো প্রথাগত শিক্ষা ছিল না।প্রথমদিকে তিনি লেখার হিজিবিজি কাটাকুটিগুলিকে একটি চেহারা দেওয়ার চেষ্টা করতেন। এই প্রচেষ্টা থেকেই তার ছবি আঁকার সূত্রপাত ঘটে।

তাঁর আঁকা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চিত্র হল ডান্সিং ওম্যান, স্ট্যান্ডিং ফিগার, হেড স্টাডি, ওম্যান’স ফেস, ওম্যান উইথ ফ্লাওয়ার ইত্যাদি।

Rabindra museum
Rabindra museum

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৃতিত্ব, পুরষ্কার অর্জন এবং সম্মান

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খ্যাতি সারা বিশ্বজুড়ে।

১৯১৩ সালে রবি ঠাকুর প্রথম ভারতীয় তথা এশিয়ার অধিবাসী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ ‘সং অফারিংস’-এর জন্য তিনি এই পুরষ্কার লাভ করেন।

১৯১৫ সালে ব্রিটিশরা তাঁকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তবে জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘৃণ্য ঘটনার প্রতিবাদে ১৯১৯ সালে তিনি এই উপাধি ত্যাগ করেন।
জাপানের ডার্টিংটন হল স্কুলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

ব্রিটিশ সরকার তাঁর সাহিত্যে অবদানের জন্য তাঁকে ‘বিশ্বকবি’ উপাধি দেয়। ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় নামে এক পত্রকার তাঁকে ‘কবিগুরু’ উপাধি দিয়েছিলেন।
১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি. লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৪০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাংগঠনিক কাজ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাংগঠনিক কাজগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল:

শ্রীনিকেতন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১২ সালে রায়পুরের জমিদার কর্নেল নরেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহের কাছ থেকে সুরুল গ্রাম সন্নিহিত কুঠিবাড়িটি দশ হাজার টাকায় কিনে নেন।
সুরুল গ্রামটি শান্তিনিকেতন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত । ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয় স্থাপনের পর থেকে রবীন্দ্রনাথ পল্লিসংস্কার নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। সুরুল কুঠিবাড়িটি কেনার পর তিনি অল্পবিস্তর কাজও শুরু করেন। ১৯২১ সালের শেষভাগে রবীন্দ্রনাথ স্থাপন করেন “পল্লীসংগঠন কেন্দ্র”।

১৯২৩ সালে পল্লীসংগঠন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রীনিকেতনের কাজের উদ্দেশ্য ছিল কৃষির উন্নতি, রোগ নিবারণ, সমবায় প্রথায় ধর্মগোলা স্থাপন, চিকিৎসার সুব্যবস্থা, ও স্বাস্থ্য বিষয়ে গ্রামবাসীদের সচেতন করে তোলা। ১৯৬৩ সালে শ্রীনিকেতনে একটি কৃষি মহাবিদ্যালয় পল্লীশিক্ষাসদন এবং ১৯৭৭ সালে পল্লীচর্চাকেন্দ্র স্থাপিত হয়।

বর্তমানে পল্লীসংগঠন বিভাগের অধীনে রয়েছে পল্লী সম্প্রসারণ কেন্দ্র, শিল্পসদন, সংগীত-বিভাগ, পল্লীচর্চাকেন্দ্র ও গ্রামীণ গ্রন্থাগার।এছাড়াও শ্রীনিকেতনে রয়েছে শিক্ষাসত্র, শিক্ষাচর্চা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গনওয়াড়ি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ যে কুঠিবাড়িটি কিনেছিলেন তার সংস্কার করা হয়েছে।এই বাড়িতেই বর্তমানে শ্রীনিকেতনের জনসংযোগ দপ্তর, ডাকঘর ও পল্লীচর্চাকেন্দ্রের দপ্তর। শ্রীনিকেতনের বার্ষিক উৎসব পালিত হয় প্রতি বছর ৬-৯ ফেব্রুয়ারি।

শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ ভবন
শান্তিনিকেতনের উত্তরায়ণ ভবন

শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতী বিদ্যালয়

শান্তিনিকেতন পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের নিকট অবস্থিত একটি আশ্রম ও শিক্ষাকেন্দ্র। ১৮৬৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিভৃতে ঈশ্বরচিন্তা ও ধর্মালোচনার উদ্দেশ্যে বোলপুর শহরের উত্তর-পশ্চিমাংশে শান্তিনিকেতন একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা কালক্রমে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নেয়।
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ১৯১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর বিশ্বভারতীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপর ১৯২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল বিশ্বভারতীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এখানে।

বসন্ত উৎসব

১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। ১৯০৭ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি, বসন্তপঞ্চমীতে, শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে, যে ঋতু উৎসবের সূচনা হয়, তারই পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত রূপ শান্তিনিকেতনের আজকের এই বসন্ত উৎসব বা বসন্তোৎসব।

দোলপূর্ণিমার দিনে এই বসন্তোৎসব পালিত হয়। বিশ্বভারতীর বিভিন্ন ভবনের ছাত্র-ছাত্রীরা সকাল থেকে কবিগুরুর গান, নাচ এবং কবিতার মাধ্যমে দিনটি পালন করে। প্রত্যেকজন বাসন্তী রঙের পোশাক পড়ে এবং একে অপরকে আবির দিয়ে অভিবাদন জানায়। বসন্ত উৎসব বাংলার ইতিহাসে এক সুবর্ণ অধ্যায়।

Rabindra Bharati University Basanta Utsav
Rabindra Bharati University Basanta Utsav

পৌষমেলা

শান্তিনিকেতনের আর এক উল্লেখযোগ্য উৎসব হল পৌষমেলা।

১২৫০ সালে ৭ ই পৌষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে ব্রাহ্ম মন্দির স্থাপিত করেছিলেন। এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মরণেই প্রতি বছর ৭ ই পৌষ তিনদিন ধরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলার প্রধাণ আকর্ষণ হল বাংলার লোকসঙ্গীত মূলত বাউল গানের অনুষ্ঠান।

১২৬ বছর ধরে এই মেলা আয়োজিত হয়ে আসছে। ১৯৪৩ সালে মন্বন্তরের কারণে এবং ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক অশান্তির কারণে এই মেলা বন্ধ ছিল।

ধর্মের ছুঁতমার্গ, সামাজিক বিধিনিষেধ বা লোকাচারের বাড়াবাড়ি— এর কিছুই ছুঁতে পারেনি রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনকে। শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব এবং পৌষমেলা এখনও আন্তরিক এবং অমলিন আনন্দের উৎস।সরস্বতীর পূজার দিন শুরু হলেও পরবর্তী কালে এই অনুষ্ঠান বিভিন্ন বছর ভিন্ন ভিন্ন তারিখ ও তিথিতে হয়েছে।

শান্তিনিকেতনের প্রাণপুরুষ রবীন্দ্রনাথের বিদেশযাত্রা বা অন্য আরও দিক মাথায় রেখে কোনও এক নির্দিষ্ট দিনে আশ্রমবাসী মিলিত হতেন বসন্তের আনন্দ অনুষ্ঠানে।

জাতীয় সঙ্গীত এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভারত

‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ ভারতের জাতীয় সংগীত জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে। এই গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন।
২৭ ডিসেম্বর, ১৯১১ সালে কলকাতায় আয়োজিত জাতীয় কংগ্রেসের ২৬তম বার্ষিক অধিবেশনে এই গানটি প্রথম গাওয়া হয়। ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ গানটির প্রথম স্তবকটি স্বাধীন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে ১৯৫০ সালে।

‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান সংগীত-সংকলনের স্বদেশ পর্যায়ভুক্ত ১৪ সংখ্যক গান। কবির সঞ্চয়িতা কাব্য-সংকলনে এই গানটি ভারত-বিধাতা শিরোনামে মুদ্রিত। অধুনা অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের মদনপল্লী নামক স্থানে রবীন্দ্রনাথ জনগণমন-এর ইংরেজি অনুবাদ করেন।

ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালে কোনো জাতীয় সংগীত নির্বাচিত হয়নি। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পরে জাতিসংঘে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের কাছে কোনো এক অনুষ্ঠানে বাজানোর জন্য ভারতের জাতীয় সংগীতের একটি রেকর্ড চাওয়া হয়। তখন ভারত সরকার জনগণমন বাজানোর পক্ষে মত প্রকাশ করেন। সরকারের সম্মতিতে গানটির গ্রামোফোন রেকর্ড সেই অনুষ্ঠানে সাফল্যের সঙ্গে বাজানো হয়।

পরবর্তীকালে গায়নযোগ্যতার কারণে বন্দেমাতরম-এর বদলে জনগণমন-কেই ভারতের জাতীয় সংগীত করার পক্ষে বিশেষজ্ঞরা মতপ্রকাশ করেন।

ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক প্রধান রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যগুলির সাংবিধানিক প্রধান রাজ্যপাল এবং বিভিন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানদের (অনুষ্ঠানবিশেষে) জাতীয় অভিবাদন জানানোর সময় জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।
প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে ও প্রজাতন্ত্র দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনকালে জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় উঠে দাঁড়ানো কর্তব্য। পূর্বে সিনেমা হলে সিনেমা শেষ হওয়ার পর জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর প্রথা ছিল। বর্তমানে সিনেমা শুরু হওয়ার আগে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়।

এছাড়াও কয়েকটি ক্ষেত্রে জাতীয় সংগীত ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন, সেনাবাহিনীতে লয়্যাল টেস্ট প্রদানের সময়, নৌবাহিনীর পতাকা উত্তোলনের সময়, কুচকাওয়াজের সময় ইত্যাদি।

বাংলাদেশ

‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছেন। বাউল গায়ক গগন হরকরার গান “আমি কোথায় পাব তারে” থেকে এই গানের সুর ও সঙ্গীত নেওয়া হয়েছে ।

১৯৭২ সালে ১৩ জানুয়ারি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে গানটির প্রথম দশ লাইন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নির্বাচিত হয়।১৯৭১ সালে ১ মার্চ গঠিত হয় স্বাধীন বাংলার কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ।
পরে ৩ মার্চ তারিখে ঢাকা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভা শেষে ঘোষিত স্বাধীনতার ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এই গান প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া হয়।

বিবিসি বাংলার তৈরী সেরা কুড়িটি বাংলা গানের মধ্যে এই গানটি প্রথম স্থান দখল করে। ২০১৪ সালে ২৬ মার্চ, জাতীয় প্যারেড ময়দান, ঢাকা, বাংলাদেশে একসঙ্গে ২৫৪,৫৩৭ জন জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ায় মাধ্যমে গিনেস বিশ্ব রেকর্ড করে। চলচ্চিত্রকার শহীদ জহির রায়হান ১৯৭০ সালে এই গানের চলচ্চিত্রায়ন করেন।

আমার সোনার বাংলা
আমার সোনার বাংলা

পড়ুন :- পরেশনাথ জৈন মন্দির কোলকাতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় অনেক স্মারক তৈরী হয়েছে।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৮ ই মে কলকাতায় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রাঙ্গণ জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে অবস্থিত। দ্বিতীয় প্রাঙ্গণে কাশীপুরে-ব্যারাকপুর গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ধারে অবস্থিত। এই বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা এবং দৃশ্যকলার পাঠ দেওয়ার জন্য বিখ্যাত।

বাংলাদেশে কবির নামাঙ্কিত একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত।

রবি ঠাকুরের নামাঙ্কিত কলকাতায় তৈরী হয়েছে একটি ঐতিহাসিক মঞ্চ এবং প্রেক্ষাগৃহ। মঞ্চটির নাম ‘রবীন্দ্রসদন’। এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান কার্যালয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত বিভিন্ন সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান এই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয়। প্রেক্ষাগৃহটির নাম ‘নন্দন’ রাখা হয়েছে। ‘কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব’ এই প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত হয়। এই ‘নন্দন’-এর লোগোটি বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি।

হাওড়া এবং কলকাতার সংযোগকারী হাওড়া ব্রিজ ‘রবীন্দ্র সেতু’ নামে পরিচিত।

কলকাতায় বৃহত্তম ঝিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামানুসারে নামাঙ্কিত ‘রবীন্দ্র সরোবর’।

বাংলাদেশের ‘মণিহার’ সিনেমা হল থেকে চৌরাস্তার মোড় পর্যন্ত সড়কটির নাম রবীন্দ্রনাথের নামানুসারে রবীন্দ্রনাথ সড়ক দেওয়া হয়।

২০১০ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ প্রকাশের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে কলকাতা মেট্রোর নাকতলা স্টেশনটির নামকরণ করা হয় ‘গীতাঞ্জলি মেট্রো স্টেশন’।

RABINDRA SAROBAR
RABINDRA SAROBAR

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণী

“নিন্দা করতে গেলে বাইরে থেকে করা যায়, কিন্তু বিচার করতে গেলে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়।“
“শিমুল কোটিই হোক বা বকুল কোটিই হোক, আগুনের চেহারাটা একই।“
“ভালোবাসার কথাটা বিবাহ কথার চেয়ে, আরো বেশি জ্যান্ত। ”
“পাপকে ঠেকাবার জন্য কিছু না করাই তো পাপ।“
“মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা, আর সমস্তটাই তার অধীন।“
“তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবার দাও শক্তি।“

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী

সমগ্র বাঙালির মনের মানুষ রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ শুধু নাম নয় একটি আবেগ। সেই কারণেই ২৫শে বৈশাখ অর্থাৎ তাঁর জন্মদিবসটি প্রতিটি বাঙালি খুব সমারোহে পালন করে।
রবীন্দ্রনাথের জন্মদিবসটি রবীন্দ্রজয়ন্তী নামে পরিচিত। শুধুমাত্র ভারতীয় নয়, বহির্বিশ্বে অন্যান্য অঞ্চলের বসবাসকারী বাঙালিরাও রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করেন। পশ্চিমবঙ্গে এই দিনটি রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে পালিত হয়।

রবীন্দ্রজয়ন্তী বিভিন্ন রবীন্দ্রনৃত্য, রবীন্দ্রসঙ্গীত, আলোচনাসভা, আবৃত্তিপাঠ, নাট্যাভিনয়ের মাধ্যমে পালিত হয়। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত ভবনগুলিতে এই দিনে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশে শিলাইদহে তাঁর বসতবাটী ঘিরে এই বিশেষ দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে। রেডিও, টেলিভিশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। পত্র-পত্রিকাগুলি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত করে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে রবীন্দ্রমেলার আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশে শাহাজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি
বাংলাদেশে শাহাজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি

রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবস

১৩৪৮ সালের ২২শে শ্রাবণ (৭ই আগস্ট, ১৯৪১) কবিগুরু অমৃতলোকে পাড়ি দেন। প্রতি বছর তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁর অনুরাগীরা অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করেন কবিকে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনাসভা, তাঁর মূর্তিতে মাল্যদান করে এবং বিশেষ প্রতিবেদন লিখে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্মরণ করা হয়।

রবীন্দ্রনাথ মানেই অনন্ত জীবন, চিরজীবী মানবাত্মা ও প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্যের কবি। রবীন্দ্রনাথের দানের ঐশ্বর্যে বাঙালির প্রাণ আজও সমৃদ্ধ। তিনি চলে গেলেও দেশ ও জাতির কাছে রেখে গেলেন অফুরন্ত ঐশ্বর্যের ভান্ডার।

তিনি ছিলেন মনুষ্যত্বের সাধক। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি আমাদের সবার প্রিয় কবি, প্রিয় সাহিত্যিক। রবীন্দ্রনাথের মতো মহাপ্রতিভা সমগ্র দেশেই বিরল। সুন্দরের আরাধনায় তিনি মমতাকে বিসর্জন বা মিথ্যাকে প্রশয় দেননি ।

তিনি দ্বেষ-হিংসা, দীনতা, ক্ষুদ্র-মস্ত সবার ঊর্ধ্বে উঠে গভীর মনের প্রত্যয় নিয়ে সনাতন জীবনের কথা। তাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে গিয়ে তাঁর এইসব চিন্তা এবং মানসিকতার শরিক হতে হবে আমাদের।
রবীন্দ্রনাথ দেববিগ্রহের পরিবর্তে কর্মী অর্থাৎ মানুষরূপী ঈশ্বরের পূজার কথা মেনে চলতেন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে রবীন্দ্রনাথ বাঙালির মনের মধ্যে সমান শ্রদ্ধায় বিরাজমান।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিখ্যাত কেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন কবি, সাহিত্যিক এবং চিত্রশিল্পী। তিনি প্রথম এশীয় এবং ভারতীয় হিসেবে ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার পান।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতগুলি কবিতা রচনা করেছেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় ২০০০ টি কবিতা রচনা করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছদ্মনাম কি ছিল?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছদ্মনাম ভানুসিংহ।

রবীন্দ্রনাথকে ‘গুরুদেব’ উপাধি কে দেন?

রবীন্দ্রনাথকে ‘গুরুদেব’ উপাধি গান্ধীজী দিয়েছিলেন এবং গান্ধীজীকে তিনি ‘মহাত্মা’ উপাধি দেন।

কোথায় এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

বোলপুর শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন পত্রিকার এডিটর ছিলেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯০১ সালে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার এডিটর ছিলেন।

গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের প্রধান থিম কি ছিল?

গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের প্রধান থিম ছিল ‘ডিভোশান অফ গড’ অর্থাৎ ‘ঈশ্বরের ভক্তি’।

সং অফারিংস কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা কোন বিখ্যাত কবি লিখেছিলেন?

সং অফারিংস (গীতাঞ্জলি) কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা বিখ্যাত কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস লিখেছিলেন।

‘টেগোর মিউজিয়াম’ কোথায় অবস্থিত?

‘টেগোর মিউজিয়াম’ কালিম্পংয়ের কাছে মংপো নামক স্থানে অবস্থিত।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম কবিতা কি ছিল?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম কবিতা ছিল ‘অভিলাষ’।

গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি নাম কি ?

গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি নাম সং অফারিংস (Song Offerings)।

শান্তিনিকেতন বিখ্যাত কেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় বোলপুরের শান্তিনিকেতনে অবস্থিত। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে খোলা আকাশের নীচে (উন্মুক্ত পরিবেশে) শিক্ষা প্রদান করা হয়।

আপনার কাছ থেকে আরো ৫ সেকেন্ড চাইছি এই আর্টিকেল টি শেয়ার করার জন্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।